শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

কালজয়ী আবু সাঈদ...

মোহাম্মদ নুরুজ্জামান

যুগে যুগে কালে কালে আবু সাঈদরা একবারই আসে। সময় এবং কালকে জয় করার জন্য। জাতিকে মুক্তি করতে বুক চিতিয়ে দেওয়ার জন্য। বৈষম্য দূর করার জন্য। স্বৈরাচারকে বিদায় করার জন্য। দেশকে স্বাধীন করার জন্য। ইতিহাসে অমর হয়ে থাকার জন্য। হাজার হাজার লাখো মানুষকে কাঁদানোর জন্য। ভবিষৎ প্রজন্মকে আলো দেখানোর জন্য। তরুণ প্রজন্মকে জাগিয়ে তোলার জন্য। বিশ^বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য। বিপ্লবকে সফল করার জন্য। 

বিপ্লবী আবু সাঈদ দেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর জেলার এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিলেও তার নাম ডাক আর রংপুরে সীমাবদ্ধ নেই। জেলা নগর বন্দর দেশ পেরিয়ে চলে গেছে জাতিসংঘের মাইলফলক হয়ে। জাতির মুক্তির অগ্রদূত হয়ে। ২০২৪ সালের বিপ্লবের চেতনা যতদিন জাগ্রত থাকবে ততদিন এই আবু সাঈদের নাম অগ্রদূতের তালিকাতে থাকবে। ইতিহাসের আলোচনায় থাকবে তার কবরে ফুলেল শ্রদ্ধা নিংড়াবে। দোয়া করবে। স্মরণ করবে। তার বুক চিতিয়ে দেওয়া ছবি নিয়ে গর্ববোধ করবে। ইতিমধ্যেই বিশ^বিদ্যালয়ের গেইটের নামফলকে তার নাম উঠে গেছে। এই গেইট দিয়ে যতদিন শিক্ষার্থীদের চোখে পড়বে ততদিন তাদের মানসপটে ভেসে উঠবে আবু সাঈদের ছবি। মাথায় জাতীয় পতাকাবাধা লাঠিহাতে পুলিশের বন্দুকের নলের সামনে অকতোবয় এক যুবকের কথা মনে পড়বে। 

২০০১ সালে রংপুরে পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুরের দরিদ্র পিতা মকবুল হোসেন এবং মাতা মনোয়ারা বেগমের কোলে আসে আবু সাঈদ। সেদিনকি মা মনোয়ারা বেগম জানতেন যে তার এই ছেলে একদিন জাতির মুক্তি দাতা হিসেবে জাতীয় জীবনে আবির্ভাব হবে। না তিনি জানতেন না। জানলে হয়তো ইতিহাস অন্যরকম হতো। ইতিহাসের খ্যাতি বয়ে আনার জন্যই হয়তো  ৯ ভাই-বোনের পরিবারে কেবল তার দ্বারাই সম্ভব হয় বিশ^বিদ্যালয়ে পা রাখার। 

দেশজুড়ে আরও অনেকের রক্ত ঝরেছে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পুলিশের বন্দুকের গুলিতে। প্রাণ গেছে অকাতরে। কিন্তু কাজের কাজটি হয়নি। শেখ হাসিনার মসনদ সরেনি। কিন্তু যেদিন আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দেওয়া ভিডিও জাতি দেখলো  তখন ইতিহাস বদলে গেলো। জাতি জেগে উঠলো দুর্বার গতিতে। দুর্দমনীয় গতিতে। নড়ে উঠে বিশ^বিবেক। যে গতি স্বৈরাচার হাসিনার গদি জ¦à¦²à§‡à¦ªà§à§œà§‡ ছারখার হয়ে গেল। বিদায় নিতে হলো দেশ ছেড়ে।   

আবু সাইদ কীভাবে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন তার পুরো দৃশ্য ধারণ করেছে একাধিক গণমাধ্যম। যমুনা টেলিভিশন এ ধরনের একটি ভিডিও প্রচার করেছে। এছাড়া স্থানীয়ভাবেও কেউ কেউ ভিডিও করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এসব ভিডিও থেকে তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময়ের পরিষ্কার একটি চিত্র পাওয়া গেছে।

ভিডিওতে দেখা গেছে, গুলি করার ঠিক আগমুহূর্তে পুলিশের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবু সাঈদ। উল্টো দিক থেকে রাবার বুলেট ছুড়ছিলেন পুলিশের সদস্যরা। তারপরও অবস্থান থেকে সরেননি আবু সাঈদ, দাঁড়িয়েই ছিলেন, তার হাতে ছিল একটি লাঠি। তিনি সেই লাঠি দিয়ে রাবার বুলেট ঠেকানোর চেষ্টা করছিলেন। 

ক্রমাগত রাবার বুলেটের মুখে একপর্যায়ে পিছু হটেন আবু সাঈদ, ফুটপাতে উঠে বসে পড়েন। এ সময় আন্দোলনকারী একজন দৌড়ে আসেন এবং গুলি লেগেছে- এ রকম কথা শোনা যায়। এরপর অন্যরা এসে তাকে ধরাধরি করে নিয়ে যান।

আবু সাঈদ শহীদ হয়ে শুধু নিজেকে ধন্য করেছেন বিষয়টি তা-ই নয়। ইতিহাসের পাতায় স্থান দিয়েছেন তার বিদ্যাপীঠ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইংরেজি বিভাগে ১২তম ব্যাচের মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল আবু সাঈদ। যতদিন এই বিদ্যাপীঠ থাকবে ততদিন আবু সাঈদের নামও থাকবে মাইলফলক হয়ে। 

স্বৈরাচার শাসকগোষ্ঠির দূঃশাসন গুম, খুন, হত্যা, নিপীড়ন, নির্যাতন যখন জনজীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছিল; ঠিক সেই মুহুর্তে বুকের তাজা রক্ত বিলিয়ে দিলেন আবু সাঈদ। ১৬ জুলাই ২০২৪ইং পড়ন্ত বিকেলের ঢলে পড়া রক্তিম সূর্যের সাথে জুলুম শাহীর বৈষম্যের বিরুদ্ধে নিজেকে বিলিয়ে দেন তিনি। 

সিজিপিএ-৪ এর মধ্যে à§© দশমিক à§© পেয়ে মেধা তালিকায় ১৪ তম স্থান করে যখন আবু সাঈদের ফল প্রকাশিত হলো; ততক্ষণে আবু সাঈদের নাম ইতিহাসের পাতায় উঠে গেছে। চাকরির পরীক্ষায়ও তার কৃতিত্ব পাওয়া গেছে। সহপাঠীরা নতুন করে শিক্ষাক্রমের জন্য ক্লাসে ফিরলেও, ফেরেনি কেবল আাবু সাঈদ। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডক্টর শওকত আলী শহীদ বীর আবু সাঈদকে একজন ক্ষনজন্মা বীর আখ্যায়িত করে বলেন, তার জীবন উৎসর্গ জাতিকে উদ্ধার করেছে। তার বিরত্বগাঁথা জাতি চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্বরন রাখবে। 

ইতোমধ্যে বেরোবি কর্তৃপক্ষ তার পরিবার এবং সহপাঠি শিক্ষার্থীদের দাবীর প্রতি সম্মান জানিয়ে শহীদ বীর আবু সাঈদের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেটের নামকরন সহ একটি আবাসিক হল নির্মানের উদ্যোগ নিয়েছে। তার ছোট বোন সুমি খাতুনকে বেরোবির ইংরেজি বিভাগে চাকরি দেয়া হয়েছে।  

বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নং প্রধান গেটের সামনে আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দেওয়ার সময় সংবাদকর্মীরা দেখেছেন তার বীরত্ব। প্রত্যক্ষদর্শীদের তরুন সংবাদ কর্মী আবু রায়হান জানান, আবু সাঈদের সাথে আন্দোলন নিয়ে à¦•থা বলে কয়েক কদম এগিয়ে যাওয়ার মুহূর্তেই পুলিশের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেল তাঁর বুক। হৃদয়বিদারক স্মৃতি ভুলে যাওয়ার নয়। আর এক সংবাদকর্মী এবং শিক্ষার্থী তাওহিদুল হক সিয়াম জানান, দুঃসাহসী দৃঢ়চেতা আবু সাঈদের পাশেই ছিলাম। à§«/৬ জন পুলিশ তাকে ঘেরাও করে নিরস্ত্র আবু সাঈদের বুকে অন্তত ৬০টি গুলি চালিয়ে তাকে হত্যা করে। আমরা তাকে বাঁচাতে পারিনি।

স্বৈরশাসকের দোসর বেরোবির শিক্ষক আসাদ মন্ডল ও মশিয়ার রহমান, কর্মকর্তা আবুল কালাম, তাপস কুমার ঘোষ, কর্মচারী নুরন্নবী, জনি ও নুরসহ বেশ কয়েকজন দোসর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দিকে ইট-পাটকেল মারে এবং র্দুব্যবহার করে। গুলি এবং ঢিলের আঘাতে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়। আহতদের নিরাপদে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। পরদিন à§§à§­ ই জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নং প্রধান গেটের পাশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শহীদ বীর আবু সাঈদের গায়েবানা জানাজা আদায় করা হয়। 

ইতিহাস বলছে, আবু সাঈদের হত্যাকান্ডের পর à§§à§® এবং ১৯ জুলাই র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির বিপুল সংখ্যক সদস্য ক্যাম্পাসে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে। ২০ জুলাই কারফিউ জারি হয়। à§« ই আগষ্ট ফ্যসিষ্ট স্বৈরশাসক হাসিনার পতন ঘটে। বিজয় হয় গণতন্ত্রের। এর আগে à§§à§§ ই জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি পমেল বড়–য়া, সাধারন সম্পাদক মাহফুজার রহমান শামিম সহ বেশকিছু নেতাকর্মী আবু সাঈদকে হত্যা প্রচেষ্টা চালায়।         

শহীদ বীর আবু সাঈদের হত্যার অভিযোগে বেরোবির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে একটি তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটি প্রতিবেদনও দাখিল করা হয়েছে দায়ীদের চিহ্নিত করে। এছাড়া আবু সাঈদ হত্যা মামলা পিবিআইকে তদন্তের ভার দেয়া হয়েছে। 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সাবিনা ইয়াসমিন জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরু থেকেই আবু সাঈদ সাহসের সাথে সফল ভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অপর সমন্বয়ক ও সহপাঠি মাহিদ হাসান শাকিল জানান, আবু সাঈদ অবসরে টিউশনি করে লেখাপড়ার খরচ চালাতো। সে যে কারও বিপদে সহযোগিতায় পাশে দাঁড়াতো। সমন্বয়ক রহমত আলী বলেন, আবু সাঈদের নিহতের পর ক্যাম্পাসে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে ছাত্ররীগ, যুবলীগ ও তাদের সন্ত্রাসী দোসররা। তাদের বিচার এখন সময়ের দাবি। 

আবু সাঈদ মারা যাওয়ার আগের দিন ফেসবুকে লিখেছিলেন ‘অন্তত একজন শামসুজ্জোহা হয়ে মরে যাওয়টা অনেক বেশি আনন্দের, সম্মানের আর গর্বের।’ তার মৃত্যু জগতজুড়ে সম্মানের আর গর্বের হয়ে উঠেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ